রুম নম্বর ১৪ রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প Thirteen (পর্বঃ ৩ )

এসআই কামাল খন্দকার মেয়েটিকে থামিয়ে দিলো ৷ এবং তীক্ষ্ণকন্ঠে বললো,
-আপনি কে? আর এই লোকটি বা কে?
মেয়েটি জবাবে বললো,
-আমি অনিতা ৷ আর তার নাম অর্ণব ৷ আমরা একেঅপরকে ভালোবাসি! হোটেলে আমরা এসেছিলাম দেখা করতে ৷ দেখা করেছি ৷ এখন আমরা বাসায় চলে যাবো!
.
মেয়েটি পুলিশ অফিসারকে যা যা বললো তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছেনা ৷ সে অনিতা হতে যাবে কেন? অনিতা তো লাশ হয়ে পরে আছে ৷ ভ্রু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম ৷ তার চেহারাটা দৃশ্যমান হলে বুঝতে পারতাম সে আসলে কে! অবাক হচ্ছি সে আমাকে তার বয়ফ্রেন্ড দাবি করায়!

.
এসআই কামাল খন্দকার মেয়েটিকে জোরালো কন্ঠস্বরে বললো,
-কিন্তু আপনার বয়ফ্রেন্ড এখন কোথাও যেতে পারবেনা ৷ সে আমাদেরকে এই কেসের ব্যাপারে নাকি হেল্প করবে ৷ দেখাযাক সে কিভাবে আমাদের হেল্প করে!
.
আমার বোধহয় পুলিশকে হেল্প করার কথাটা বলা ঠিক হয়নি ৷
এসআইকে নিচুস্বরে বললাম,
-সরি স্যার, আমি তখন মুখ ফসকে এমনি একটা কথা বলে ফেলেছিলাম ৷ তবে হ্যাঁ, ঐ যে বেডে বসে আছে যে ছেলেটি, সে অবশ্যই বলতে পারবে মেয়েটিকে কে খুন করেছে ৷ কারণ, তাকে খুন হওয়া মেয়েটির সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যার আগে এই রুমে ঢুকতে দেখেছিলাম!
এসআই মাথা উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদ্যুভাবে হাসলো ৷ এবং জবাবে বললো,
-ছেলেটি এই মেয়ের ভাই হয় ৷ সে খুনের ব্যাপারে তেমন কিছু বলতে পারছেনা ৷ মেয়েটি যখন খুন হয় তখন সে ওয়াশরুমে ছিলো ৷ খুন হবার বেশকিছুক্ষণ পর সে ওয়াশরুম থেকে বের হয় এবং তার বোনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়! ছেলেটার নিকট অস্ত্র নেই, এমনকি তার শরীরে রক্তের ফোঁটাও নেই ৷ তাই তাকে খুনী হিসেবে সন্দেহ করতে পারছিনা!
.
চমকে উঠলাম ৷ বিস্মিত নয়নে একবার এসআইয়ের দিকে আরেকবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলাম ৷ আমি ভেবেছিলাম ছেলেটির সঙ্গে অনিতার ভিন্নরকম সম্পর্ক রয়েছে ৷ কিন্তু এখন দেখছি তারা ভাই বোন! কিন্তু অনিতার ভাই তো ওরকম দেখতে না ৷ নিশ্চয় ছেলেটি পুলিশকে মিথ্যা বলেছে ৷ আর নাহয় যে মরে পরে আছে সে অনিতা নয়! অনিতার মত দেখতে Doppelganger হবে ৷ তাহলে আসল অনিতা কই গেলো? নিশ্চয় মুখ ঢেকে আছে সেই অনিতা, কিন্তু তার চেহারা না দেখে শুধু তার কথার প্রেক্ষিতে কি করে তাকে অনিতা ভাবতে পারি? এসআই কে বললাম,
-ঠিকআছে স্যার, আমি তাহলে যাই ৷ আমার বাসায় যেতে হবে!
এসআই বললো,
-অবশ্যই বাসায় যাবেন ৷ তবে আপনার বায়োডাটা দিয়ে যান ৷ আপনার নাম ঠিকানা ফোন নম্বর লাগবে আমাদের ৷ সেইসাথে আপনার ছবি ৷ এই হোটেলের দ্বিতীয় তলায় যতটা রুম আছে, প্রতিটা রুমে অবস্থানরত সবারই তত্ত্ব উপাত্ত সংরক্ষণ করছি আমরা ৷ সময় হলে প্রত্যেককে আমরা আদালতে ডাকবো!
-ঠিকআছে, বায়োডাটা দিচ্ছি আমি!
এসআই আমাকে একজন কনস্টেবলের সঙ্গে আড়ালে যেতে বললো ৷ সেকেন্দার আলী নামের একজন কনস্টেবলের সঙ্গে গেলাম আমি ৷ মধ্যবয়সী লোকটি ৷ তার মুখভর্তি দাঁড়ি গোফ ৷ গায়ের রং হলদে সাদা ৷ দেখতে ইংলিশদের মত লাগে ৷ ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকা মেয়েটিও আমার সঙ্গেই এলো ৷ সেকেন্দার আলীকে আমার নাম ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে দিলাম, এবং সে আমার একটা ছবিও তুললো ৷ কনস্টেবল ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকা মেয়েটির থেকেও নাম ঠিকানা ও ফোন নম্বর নিলো ৷ চমকে উঠলাম যখন মেয়েটি তার ফোন নম্বর বললো ৷ তার বলা এই নম্বরটা তো অনিতার ৷ সে অনিতার নম্বর পেলো কোথা থেকে? অনিতার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক? আর সে নিজেকে অনিতা বলে দাবি করছে কেন? তার মুখটা দেখতে পারলে ভালো হতো ৷ কিন্তু যেভাবে মুখ ঢেকে রেখেছে তাতে মনে হচ্ছেনা সে মুখ দেখাবে! সেকেন্দার আলী মেয়েটির ফটো তুলতে চাইলে সে আপত্তি করলো এবং বললো,
-আমি নিজের চেহারা কাউকে দেখাইনা ৷ ফটো তুলতে পারবেন না, দুঃখিত আমি!
সেকেন্দার আলী মেয়েটির দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,
-পুলিশকে মুখ দেখাতেই হবে ৷ আমরা মনোরঞ্জনের জন্য ফটো চাইছিনা আপনার থেকে ৷ এই কেসের তদন্তের জন্য হোটেলে অবস্থিত সবারই ফটো নিচ্ছি ৷ আপনার ফটোও লাগবে আমাদের!
-দুঃখিত, ফটো পাবেন না ৷ আমার নাম, ঠিকানা ফোন নম্বর সব দিয়েছি ৷ আমাকে প্রয়োজন পরলে ফোন দিবেন, আমি আপনাদের নিকট হাজির হবো!
-তারমানে আপনি ফটো দিবেন না?
-না ৷
-ঠিকআছে, সমস্যা নেই ৷ আপাতত আপনি আসতে পারেন!
.



আমার রুমে চলে এলাম ৷ মেয়েটিও আমার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো ৷ এবং মুখ থেকে ওড়নাটা সরিয়ে ফেললো ৷ বিস্মিত হলাম তাকে দেখে ৷ একদম অনিতার মত দেখতে সে ৷ আমার অবচেতন মন বললো হ্যাঁ, সে অনিতা ৷ আমি নিশ্চিত হলাম যে আমার গার্লফ্রেন্ড খুন হয়নি, অন্য কেউ খুন হয়েছে!
অনিতা নিচুস্বরে বললো,
-যত তাড়াতাড়ি পারো এই হোটেল ছাড়ো ৷ দেরি করলে ঝামেলায় পরবে তুমি!
-আমি ঝামেলায় পরবো কেন?
-কারণ গতরাতে তুমি খুন হওয়া মেয়েটির রুমে গিয়েছিলে!
.
স্তম্ভিত হয়ে বললাম,
-সত্যিই গিয়েছিলাম নাকি? আমার স্পষ্ট মনে পরছেনা কিছু!
.
অনিতা নরম গলায় বললো,
-হ্যাঁ, তুমি তার রুমে গিয়েছিলে! এবং অনেকক্ষণ ধরে তার রুমে অবস্থান করেছিলে ৷ আর তোমার হাতে একটা চাকুও ছিলো ৷ আর চাকুটা তুমি রুমে ফেলে চলে গিয়েছিলে ৷ হয়তো তুমি লাশের বডি দেখোনি , তবে আমি দেখেছি ৷ খুনী নৃসংশভাবে মেয়েটির বুকটা চাকু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে একদম ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে ৷ গরুর কলিজা যেমন করে কাটে ঠিক সেরকমভাবে কেটেছে ৷ যেহেতু খুনটা চাকুর মাধ্যেমে হয়েছে, সেহেতু তুমি ঝামেলায় পরতে পারো ৷ পুলিশ মেয়েটির লাশ একটু পর হয়তো থানায় নিয়ে যাবে, এরপর মর্গে ৷ তারপর পোর্টমর্টেম হবে ৷ তোমার চাকুটা পুলিশ উদ্ধার করেছে, ফরেন্সিকে যাবে সেটা ৷ তোমার উচিত হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যাওয়া ৷ আর আমিও তোমার সঙ্গেই যাবো ৷ তোমাকে একা ছাড়ছিনা!
-আচ্ছা, আমি এখনই রওনা দিবো ৷ কিন্তু যে মানুষটার জন্য এই হোটেলে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা না করলে কেমন হয়?
-কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছো?
-একটা মেয়ে, ফটোশুটের জন্য এই হোটেলে গতকাল আসতে বলেছিলো আমাকে! কাল তো আসেনি সে, কিন্তু আজ সকালে আসার কথা ছিলো, কই আসছেনা তো!
-তোমার কি মনে হয় সে আসতে পারে?
-মনে হচ্ছে আসবেনা ৷
-সে কি পরিচিত?
-নাহ, এইতো গতপরশু তার সাথে কয়েকবার শুধু ফোনে কথা হয়েছিলো!
-চেহারাও দেখোনি?
-নাহ!
-তাহলে সে যদি এখানে আসে তবে তাকে তুমি চিনবে কি করে?
-এসে সে ফোন দিবে বলেছিলো!
-ধুর আসবেনা সে!
-আমারও তাই মনে হয়!
-তাহলে যে আসবেনা তার জন্য এখানে অপেক্ষা করে তোমার কোনো লাভ আছে? সো, আমি যা বলছি সেটা করো!
-হ্যাঁ, বাসায় যাবো ৷ কিন্তু এরপূর্বে সত্যি করে বলোতো— যে মেয়েটা খুন হয়েছে তার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক আছে কি?
অনিতা ভ্রু কুঁচকে তাকালো ৷ শক্তকন্ঠে বললো,
-চেহারায় মিল আছে বলে কি আমাদের মধ্যে সম্পর্ক থাকবে? এটা সত্য যে তাকে এরপূর্বে আমি কখনই দেখিনি ৷ তাকে তো প্রথমবার একনজর দেখেই টাস্কি খেয়ে গিয়েছিলাম ৷ নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে হুবহু একইরকমের দেখতে দুজন মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে থাকতে পারে!
-আমার আবছা আবছা মনে পরছে ১৪ নম্বর রুমের দুজন ব্যক্তি মারা গেছে ৷ তারা একেঅপরকে খুন করেছে ৷ এটা কি আমার মনের ভুল নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটেছে?
-আজব কথা বলছো তো তুমি, ১৪ নম্বর রুমে কেউ ছিলোই না ৷ ঐ রুমে কে খুন হতে যাবে?
.

আমার মাথায় অনিতাকে নিয়ে একটা প্রশ্ন জাগলো ৷ সে এই হোটেলে কবে কখন এসেছে?  

মন্তব্যসমূহ