সত্য ভালবাসা 💘💘

 বিয়ে করে আনার পর আমার স্ত্রী চাঁদনীকে নিয়ে বের হতে লজ্জা ই লাগতো।বেপার টা এ নয় যে আমার স্ত্রী অসুন্দরী,কুৎসিত বা মোটা।এগুলো হলে হয়তোবা লজ্জা লাগতোনা।আমার স্ত্রী সুন্দরী।যে সে সুন্দরী নয়, চট করে কোন মেয়েকে দেখে কেউ যখন বলে দিতে পারে,দেখ মেয়েটা সুন্দর না!

আমার লজ্জা টা আমায় নিয়ে।আমার স্ত্রীকে নিয়ে লজ্জা পাবার মতন সাহস আমার নাই।সে বয়সে আমার চেয়ে ৮ মাসের ছোট।
আমার থাকার মাঝে ছিল মাথায় কিছু চুল আর সৎ চরিত্র।এছাড়া আমার আর কিছু নেই চেহারাওতেমন সুদশন নয় আমার বা ছিলনা চাকরিতে ভালো বেতন।
ওই দিন চাঁদনীকে কলেজ থেকে আনতে গেলাম।চাঁদনীর বান্ধবীদের কাছে কি অকপটেই আমায় পরিচয় করিয়ে দিল,আমি তার স্বামী।তারা যে আমার আড়ালে নিশ্চই বলবে, দেখ চাদনীর বর টা কি দেখতে কী বাজে,না আছে চেহারা না আছে স্মার্টনেস,ক্ষেত একটা তাতে কোন ভুল নেই।আমি সবার চোখে টিটকারি চাহুনি দেখতে পেয়েছিলাম।
সেদিন বিছানায় শুয়ে খবরের পেপার পড়তে পড়তে চাঁদনীকে জিজ্ঞেস করলাম,আচ্ছা তোমার বান্ধবীরা কখনো বলেনা যে এই বিশ্রী আর বাজে চেহারার ছেলেকে কেন বিয়ে করলে?
চাঁদনী তখন রেগে গিয়ে বললো,আমার বর যেমনই হোক সে আমার ভালবাসার মানুষ।
ওর উল্টো রাগ দেখে আমার খারাপ লাগেনি।বরং চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল,কপালে এমন ভালো বউ ছিল। আমি একটু কল্পনায় হারিয়ে গিয়েছিলাম।
বিয়ের ৩ বছরের মাথায় আমাদের কন্যা সন্তান এলো।রুপকথা কে প্রথম কোলে নিয়েও আমি ভেবেছিলাম,যখন ও স্কুলে ভর্তি হয়ে বলবে এই আমার বাবা,তখন কি ওর বন্ধুরা হেসে বলবে,বাবা নাকি ক্ষেত?দেখতে কেমন দেখা যায়। ওর ইচ্ছা ছিল আমাদের রাজকন্যার নাম রাখবে রুপকথা।
মেয়ে হবার পর চাঁদনীর চাচাতো বোন দেখতে আসলো বাসায়।দুজন কথা বলতে বলতে এক পর্যায় বললো,আরিয়ানকে বিয়ে করা ঠিক হয়নিরে তোর।
চাঁদনী রেগে গিয়ে বললো,কেন?
তার চাচাতো বোন আমতা আমতা করে বললো আমি জানি তোর মনে কষ্ট।ওর চেহারা দেখছোত কেমন কেমন ক্ষেত।আর বাজে দেখতে।দেখতে মায়াবী ভাব ও নাই।ওর সাথে তোরে মানায় নাই।
চাঁদনী ক্ষেপে গিয়ে তখন বলে ফেললো, নিজে কারে বিয়ে করছো।মেদওয়ালা টাকলা বুইড়া।খালি টাকাটাই পাইছোত বুইড়া থেকে। আমার বর আমায় যতটা ভালবাসে তা আমি কোটি টাকার বিনিময়ে ও পাওয়া যাবে না।
সেই কথার ভিত্তিতে তাদের সম্পর্ক একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। কি অদ্ভুত মেয়েরা তাইনা!স্বামীকে কিছু বললে তারা তাদের রক্তের সম্পর্কের সাথেও যুদ্ধ করে।
চাঁদনীকে বললাম এভাবে বলা ঠিক হয়নি। ও বলল মিথ্যে কিছু বলিনি।তুমি বলতে যে বাজে আর বিশ্রী লোককে কেন বিয়ে করছি।
এই কথা নিয়েও রেগে বউটা আমার সাথে ৩ দিন কথা বলেনি।
অনেক হাসাতে চেষ্টা করেও ওকে হাসাতে পারছিনা।শেষ রাতের দিকে নিজের ইচ্ছেতেই এসে আমায় জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল।
বললাম কি হয়েছে চাঁদনী?






চাঁদনী: আচ্ছা মানুষের চেহারাই কী সব বলো?
চাদনীর ভিতর অনেক টা আমার মায়ের গুন ছিল।সে যুক্তি বা উদাহরণ দিয়ে মানুষ কে ঘায়েল করে ফেলে।ভোর রাতে এমন কথা শুনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর এসব বলবোনা।আমি ও সাথে সাথে বলেছিলাম আমি কী খুব স্মার্ট???
চাঁদনী হেসে কুটি কুটি হয়ে আমার বুকে মাথা রেখে বললো,ইয়েস,আমার বরটা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুদশন পুরুষ এবং অনেক স্মাট।
রুপকথা ক্লাস থ্রী তে উঠলো।চাঁদনী আজকাল কেমন মনমরা হয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝি হয়তো এতদিন বাচ্চামি কেটে গেছে ওর। ও এখন অনুভব করে,সি ডিজার্বস বেটার।
জানালার পাশে প্রায় ই দাড়িয়ে আনমনে তাকিয়ে থাকে।প্রতিজ্ঞার কারনে বলিও না যে চাদনী আমি দেখতে বাজে তাই বলে আমায় তুমি দয়া করোনা।
অল্প বয়সের চাদনীর চোখের নিচে কালি জমে গেছে।রাতে বারান্দায় বসে জিজ্ঞেস করালাম,চাঁদনী তোমার কী মন খারাপ?
চাদনী মলীন ভাবে বললো না।
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম,এই যে আমার কেয়ার নিতে নিতে নিজের যত্ন করা ছেড়ে দিয়েছো।
চাঁদনী:কই?মনে হয় চোখে সমস্যা হইসে তোমার। সব উল্টা পাল্টা দেখো।এই বলে রেগে চলে গেল।
বিছানায় গিয়ে শুতেই চাদনী আমার দিকে ফিরে বললো রাগ করেছো?মাফ করে দেও।
ইদানীং ওর হাব ভাব বুঝতে পারিনা।সব কিছুর আগে পরে ক্ষমা চায়।
চাঁদনী ক্ষমা চাইছো কেন?
চাঁদনী হেসে বলে যদি চলে যাই? ক্ষমা চাইবার সময় না পাই?
আমার বুক টা ধক করে উঠলো।তার মানে কি ও আমায় ছেড়ে চলে যাবে অন্য কারো কাছে?
আজ ওর মুখে শুনে কষ্ট হচ্ছে।হয়তো এতদিনে বৃদ্ধ বয়সের সাথি ওকেই ভেবে ফেলেছি।এখন চট করে সব ফাঁকা হয়ে গেলে আমি কি করে মেনে নিব!
আজকাল অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে ভয় পাই খুব।মনে হয় বাসায় গিয়ে সব ফাঁকা দেখবো।টেবিল এর উপর খাম দেখতে পাবো।
বাসায় ঢুকে টেবিল এর উপর সাদা কাগজ দেখে বার বার চাঁদনীকে ডাকছি।বার বার গলা ধরে এসেছে।কী করবো আমি!কিভাবে বাঁচবো ভাবতে ভাবতে কান্না করে বসে পরলাম।
চাদনী ঘাড় এ হাত রেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো এই কী হয়েছে তোমার! কাঁদছো কেন?অফিসে কিছু হয়েছে?
আমি চাঁদনীকে জড়িয়ে ধরে বললাম তুমি যাওনি?
চাঁদনী: কই যাব? ওয়াশ রুমে ছিলাম।ডাকার সাথে সাথে আসি কিভাবে?আমার কি পাখা আছে?নাকি পায়ে চাকা ফিট করা?
আমি চোখ মুছে টেবিল এর উপর কাগজ টা তুলে বললাম এটা কি?
চাঁদনী: তোমার মেয়ে তোমায় এঁকেছে। আমায় বার বার বলে গেছে পাপা অফিস থেকে আসার পর ই দেখাতে।
আমি হেসে দিলাম।
চাদনী আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো, তুমি ভেবেছিলে আমি চলে গেছি হি হি
আরিয়ান: আরেনা।ভাত দেও ক্ষুধা লেগেছে।
জ্বরের মাত্রা বেড়ে চলেছে চাঁদনীর।তার ভিতরে বার বার বলছে,রুপকথার বাবা ভেবেছিলাম আমি তোমার সেবা করবো কিন্তু দেখোনা আজ তোমার ই সেবা করা লাগছে।আল্লাহ চাইলে এমন ই হয়।বার বার নিজেকে বাজে আর বিশ্রী ভেবে আর বলে আমার পাপ বাড়িয়েছো তাই আল্লাহ আমায় পাপের শাস্তি দিয়েছেন। আল্লাহ আমার উপর ক্ষেপে গিয়েছেন।
আমি ওর মুখে হাত দিয়ে বললাম,বউ এর সেবা করতে পারে কজন?আল্লাহ আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন?
চাঁদনী: কিসের পরীক্ষা?
আরিয়ান: আমি স্মাট আর সুদশন বলেছিলে না তার যোগ্য কিনা সেটার।
চাদনী জ্বরের ভিতর ও থেমে থেমে হাসছে।
অফিস যাবার আগে চাঁদনী আমায় হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, সকালের নাস্তা করে দিতে পারলাম না।খুব ক্লান্ত আমি।আজ যেওনা অফিসে।
আমি সেদিন রয়ে গেলাম।এদিকে চাঁদনী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে গেল।
এদিকে চাঁদনীর বুকে মাথা রেখে আরিয়ান বলল,
আরিয়ান : আচ্ছা আমি মারা গেলে রুপকথার এর কি হবে?
চাদনী এই কথাটা শুনে থমকে গিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করল মাথা কি গেছে একেবারেই?রুপকথা আসুক স্কুল থেকে ওর জানা উচিৎ ওর বাবা পাগল হয়েছে
আরিয়ান: শোন না আমি কাল আমার একবন্ধুকে স্বপ্ন দেখলাম।আমায় লাল জামা দিয়ে বলছে এদিকে অল্প বয়সে যারা আসে তারা লাল জামা পরে।এটা পরে নে।
চাদনী আমার কপালে হাত দিয়ে বলল কী বলছো ওল্টা পাল্টা,আমি আছিনা?
আরিয়ান চাদনীকে জড়িয়ে ধরে বললো,আমার না খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে জানো?
বিয়ের পর নাম ধরে বা ওগো বলে ডাকতে লজ্জা হতো।বার বার চাইতাম বাচ্চা আসুক, ওর মা বলে ডাকবো।রুপকথা আসার পর ওগো বলতে খুব ইচ্ছে হতো।এখন আমার ইচ্ছে হয় দুজন বৃদ্ধ বয়সে ঘুরে বেড়াতে পারতাম!মেয়েকে বিয়ে দেবো।
চাঁদনী ধমক দিয়ে বলল,মেয়ে বিয়ে দেও আগে।এখন থামো
আরিয়ান: মরে যাবার পর সাথে সাথেই বিয়ে করে ফেলোনা যেন। যদি আমি আত্মা হয়ে দেখার সুযোগ পাই, কিনা রাগে আবার মরে যাই। পর পর দুবার মরার ব্যাথা নেয়া কি ঠিক হবে?
চাঁদনী : কি বলছো?
আরিয়ান মলীন মুখ নিয়ে চোখ বন্ধ করে বললো, মেয়ের তাগিদে বিয়ে করো।আমি কষ্ট পাবোনা।
আরিয়ান চোখ না খুলেই বললো মাই ওয়াইফ ইজ বিউটিকুইন।
ঠিক তার এক সপ্তাহের মাথায় ই আরিয়ানের ব্রেন ক্যান্সার ধরা পরলো।আরিয়ান সময় ই দিল না সেবা করার।মাস খানেক এর মাঝেই চাঁদনীকে ছেড়ে চলে যায় না ফেরার দেশে 😭😭
সেদিন আরিয়াম নিজেই বললো আজ খুব সুস্থ লাগছে।ব্রেন ক্যান্সার ও মনে হয় বউয়ের সেবায় ভালো হয়ে যায়।
ওইদিন আরিয়ান নিজ থেকেই খাবার রান্না করলো।ওর এমন হাসি মুখ দেখে বুকে সাহস পাচ্ছিলো চাঁদনী।হয়তো মিরাকল কিছু হবে।
রাতে শুয়ে কাছুমাছু হয়ে বুকে মাথা রেখে বললো রুপকথা আমার সি সি ক্যামেরা।ও আমার হয়ে নজর রাখবে।উল্টা পাল্টা করলেই খবর আছে কিন্তু।চাঁদনী খুব হাসলো।ওর হাসিমুখ দেখলেই আমার মন ভরে যায়(আরিয়ান)
গভীর রাতে বুকটা চাঁদনী কেমন শীতল অনুভব করলো।ভেবেছিলো আরিয়ানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে হয়তো জ্বর আসবে।কিন্তু না,আরিয়ান শক্ত হয়ে গেল।আমার কোমল মনের ভালবাসার মানুষটা টা অল্প কয়েক ঘন্টার মাঝে এমন শক্ত হয়ে গেল কী করে!সেই উত্তর আমি আজ ও পাইনি।পাবো ও না।
রুপকথার ভার্সিটিতে আজ প্রথম দিন আমায় নিয়ে এলো জোর করে।চারদিকে এমন তরুণ তরুণীর মা বাবার ভিতর নিজেকে বয়স্ক লাগছে।আরিয়ানের চলে যাওয়াও আমার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে তিনগুন।আরিয়ানের জায়গায় কাউকে আনতে পারিনি।আরিয়ানের মতো কেউ হয়তো এভাবে দাম দিতনা।আমি জীবনে শুধু স্বামীই পেয়েছিলাম না স্বামীর মতন স্বামী পেয়েছিলাম।যার বিরহে আমি কাঁদতে পারি আমরণ। আমার ক্লান্তি আসবেনা।
মেয়ে এসে বললো চলো আম্মু সেল্ফি তুলি।
আমি বললাম কিসের পিক আর মা?
রুপকথা আমার হাত শক্ত করে ধরে বললো,মাই মম ইজ বিউটিকুইন।মেয়েরা নাকি বাবার মতো হয়। ঠিক তাই হয়েছে।
খানিক সময় মনে হলো আরিয়ান ফিরে এসেছে আমার মেয়ের ভিতর।আবার মনে হল আরিয়ানের গলা মেয়ের গলায় বসিয়ে দিল।বার বার মনে হচ্ছে আরিয়ান বলছে,কিগো বলেছিলাম না আমার মেয়ে হলো আমার কার্বন কপি।আমার সি সি ক্যামেরা।ও নজরে রাখবে তোমায়।মিললো তো?
সমাপ্তি

মন্তব্যসমূহ