পর্ব ১
আজকে আমার স্বামী আমার আপন খালাত বোনকে ২য় বিবাহ করতেছে।বিয়েটা আমার সম্মতিতেই হচ্ছে।এমনটা না যে আমি আমার স্বামীকে জোর করে বিয়ে করতে বলেছি আর সে করছে।বিষয়টা এমন যে আমার স্বামী আর আমার সম্মতিতেই বিয়েটা হচ্ছে।
আমি সাদিয়া বয়স ২৯।অনার্স কমপ্লিট করার পরপরই বিয়েটা করেছি।আমাদের প্রেমের বিয়ে।প্রেমটা প্রণয়ে রূপ নেয় ২০১৬ সালে।এর আগে আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল।প্রথমে আমার পরিবার আপত্তি করলেও আমাদের একনিষ্ঠ জোরাজোরিতে সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
২০১৬ সালের মার্চ মাসের কথাটা কখনও ভুলব না।সেদিন আমি আমার ভালোবাসার মানুষ রাজিবকে আপন করে পেয়েছিলাম।
(রাজিব আমার স্বামী যার আজকে আমার খালাত বোনের সাথে।রাজিব একটা সরকারি কর্মকর্তা বয়স ২৯।আমার সমবয়সী।)
যাইহোক এবার ঘটনাই আসা যাক।রাজিবের সাথে বিয়ের পর থেকেই আমাদের জীবনটা একদম বদলে গেল।রাজিবকে পেয়ে আমি খুব খুশি ছিলাম।রাজিব আমার ভালো লাগা, খারাপ লাগা সবকিছুর খেয়াল রাখত।রাজিব ও আমাকে অনেক ভালোবাসে।ভালোবাসা, রাগ অভিমান, খুনসুটির মধ্য দিয়েই বিয়ের ২ বছর পার করলাম।বিয়ের ২ বছর পর আমার খুশিটা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায় এ কারনে যে আমি মা হতে চলেছি খবরটা নিশ্চিত হতে পেরে।সেদিন রাজিবের মুখেও এতটা খুশি ছিল যে তাকে দেখে মনে হয়েছিল যে আমি তাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিতে চলেছি।ইশ কি যে মুহূর্ত ছিল সেটা এখনও মনে হলে চোখের কোণে আনন্দ অশ্রূ বেয়ে পড়ে।
কিন্তু সে আনন্দটা ফিকে হয়ে যায় মাস তিনেক পরেই।কারন আমার বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায়।কেন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেটার কারনটা আমি জানি না।কারন ডাক্তার সমস্ত কিছু রাজিবকে বলেছিল।আমার মন খারাপ হবে বলে রাজিব আমাকে কোন কারন বলে নি।সেদিন আমার বাচ্চাটার জন্য আমি যতটুকু কেঁদেছিলাম জানি না তার চেয়ে ও বেশি কেঁদেছিল আমার স্বামী।তার কান্না দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু কান্নার মাত্রাটা আরও প্রবল হল তখন যখন জানতে পারলাম আমি আর কখনও মা হতে পারব না।আমার মা হওয়ার ক্ষমতা চলে গিয়েছে।তখন এতটাই কষ্ট পেয়েছিলাম রাজিবের কথা ভেবে যে আমি আর কখনও রাজিবকে সন্তান দিতে পারব না।রাজিব সেদিন কষ্টটা প্রকাশ না করলে মুখটা দেখে বুঝা যাচ্ছিল যে ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পেয়েছে। রাজিবের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না।নিজেকে শাত্ত্বণা দেওয়ার ভাষা তখন ছিল না।
কষ্ট সুখের মধ্য দিয়েই সময়ের পরিক্রমায় একটা বছর পার করে ফেললাম।তবে মা না হতে পারার যন্ত্রণাটা কোনভাবেই পিছু ছাড়ছিল না।সারাক্ষণ একটা কষ্ট বুকে জমা থাকত।রাজিব অবশ্য তার কষ্টটা আমার কাছে প্রকাশ করত না।সবসময় আমাকে ভালো রাখার চেষ্টা করত তবুও নিজেকে শূন্য মনে হত কারন আমি বউ হিসেবে তাকে একটা বাচ্চা কখনও দিতে পারব না।একদিন রাতে যখন হাউমাউ করে কেঁদে রাজিবকে বলি
-আমি তো তোমাকে কোনদিন ও বাবা হওয়ার সুখ দিতে পারব না।আমাকে ক্ষমা করে দিও।আর তুমি আরেকটা বিয়ে করে নিও।
রাজিব আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথার চুল আলতো করে টেনে টেনে বলল
-আমার এতকিছু লাগবে না।আমার পাশে তুমি থাকলেই হবে।আর তোমাকে রেখে আরেকটা বিয়ে করব ভাবলে কি করে।আজকে তোমার সমস্যা হয়েছে।আজকে তোমার জায়গায় যদি আমার সমস্যা হত তখন কি করতে?পারতে আমাকে রেখে আরেকটা ছেলেকে বিয়ে করতে।ভালোবেসে তোমাকে বিয়ে করেছি। আমার জান পাখিটার জন্য এর থেকে কঠিন কিছু হলেও মেনে নিতে পারব। নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে পারব।
এ কথা শুনে আমি রাজিবের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বললাম
-আমার জন্য তোমাকে জীবন দিতে হবে না।তুমি আমার জন্য যা করেছ এতেই আমি খুশি।আর আল্লাহ যেন আমার সব হয়াত তোমাকে দিয়ে দেয়।আমি তোমার কোলে মরতে চাই।আমি যে তোমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি।
রাজিব আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
-আরে পাগলিটা আমরা দুজন দুজনের সঙ্গী।দুজন কে যেন আল্লাহ একসাথে পরপারে নিয়ে যায়।এবার যাও তো ঘুমাও।এত রাত জাগলে হবে নাকি।সকালে অফিস যেতে হবে না।
আমি হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বললাম
-হুম ঘুমাচ্ছি তো।
রাজিব আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল।কখন যে রাজিবের আদর মাখা হাতের স্পর্শে ঘুমের রাজ্যে চলে গেলাম টেরেই পেলাম না।ঘুম ভাঙ্গল খালামনির কলে।এত সকালে খালামনি কেন কল দিয়েছে বুঝতে পারলাম না।যদিও আত্নীয় স্বজনের কোন ঝামেলা হলে সবার আগে আমাকে কল দিয়ে জানানো হয়।তা অবশ্য দুইটা কারনে ১)আমি সবাইকে সৎ পরামর্শ দেই। ২)আমি যতটুকু পারি সাহায্য করার চেষ্টা করি।
যাইহোক খালার কলটা রিসিভ করার সাথে সাথে খালা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
-হ্যালো সাদিয়া তোর সাথে একটু কথা ছিল তুই কি ফ্রি আছিস।
খালার এরকম আতঙ্ক মাখা গলা শুনে আমি বেশ ভয় পেয়ে খালাকে বললাম
-খালা কি হয়েছে।এত ভয় পেয়ে কথা বলছ কেন?আমাকে বল কি হয়েছে।
খালা ওপাশ থেকে তৃণা নামটা বলেই বেশ কাঁদতে লাগল
(তৃণা আমার খালাত বোন।যার সাথে আজকে রাজিবের বিয়ে হচ্ছে।অনার্স কমপ্লিট করেছে।দেখতে আমার চেয়েও হাজারগুণ সুন্দরী আর স্মার্ট।দুঃখের বিষয় এই যে, আমার বিয়ের ২ বছর পরেই জানতে পারি তৃণা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।অনেক চিকিৎসা করেও সুস্থ হয় নি।)
যাইহোক খালার কান্নার আওয়াজটা ফোনে বেশ জোরালোভাবে শুনা যাচ্ছিল।আমি খালাকে শান্ত গলায় বললাম
-খালা কান্না থামিয়ে বলুন তৃণার কি হয়েছে।আপনি কান্না করলে তো আমি কিছুই বুঝতে পারব না।খালা দয়াকরে কান্না করবেন না।আমাকে খুলে বলুন তৃণার কি হয়েছে?
খালা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
-তৃণা প্র্যাগনেন্ট।
কথাটা শুনে যেন আমি আকাশ থেকে পড়লাম।কারন তৃণা অবিবাহিত।আর এরকম মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ের সাথে কে এমন করল।কত নীচু মনের হলে একটা মানুষ এমন করতে পারে।খালাকে কান্না থামিয়ে বলতে বললাম যে
-খালা কি হয়েছে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলুন
খালা কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল
-রাত ১২ টার দিকে তৃণার অনেক পেট ব্যাথা শুরু হয়।তৃণাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে তারা একটা আল্ট্রা করতে বলে।আল্ট্রা করার পর জানতে পারি যে তৃণার পেটে দেড় মাসের বাচ্চা। তৃণাকে অনেক বার জিজ্ঞেস করলাম।বুঝাতে চেষ্টা করলাম তার সাথে কিছু হয়েছে কি না।কিন্তু তৃণা কিছুই বলতে পারছে না। মা তুই একবার বাসায় আয়।আমার কিছুই ভালো লাগছে না।সমাজে মুখ দেখাতে পারব না এমন কিছু হলে।মরা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই।
আমি ফোনটা রেখে রাজিবকে সবটা বললাম।রাজিব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-এর সাথে কে এমন করল।সাদিয়া তুমি এক্ষুণি যাও।আমার পরিচিত একজন ডাক্তার আছে তার কাছে নিয়ে দেখ বাচ্চাটা নষ্ট করা যায় কি না।এছাড়া তো আর কোন উপায় দেখছি না।আমি ডাক্তারকে ফোন করে দিচ্ছি।
এ বলে রাজিব ডাক্তারকে ফোন করল।আর আমি সময় নষ্ট না করে সরাসরি খালার বাসায় চলে গেলাম।খালার বাসায় গিয়ে তৃণার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
-আমার লক্ষী আপু।তোমার সাথে কেউ কি কিছু করেছে।
কিন্তু তৃণা আমার কথার মানেই বুঝতে পারছিল না।বারবার জিজ্ঞেস করার পরও কিছুই বলতে পারছিল না।খালাকে বললাম
-খালা বাচ্চা নষ্ট করা ছাড়া তো কোন উপায় দেখছি না।রাজিব একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলছে।আমি তৃণাকে ঐখানে নিয়ে যাই কি বলেন?
-সাদিয়া তুই আমার শেষ ভরসা।আত্নীয়স্বজন কেউ জানে না।এর আগে যা করার কর।না হয় আমার মান সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে।
আমি কথা আর সময় না বাড়িয়ে তৃণাকে নিয়ে চলে গেলাম ডাক্তার কোমলের কাছে।ডাক্তার কোমল আমারও চিকিৎসা করেছিল।ডাক্তার কোমল তৃণাকে চেক-আপ করার পর বললেন
-দেখুন মিসেস সাদিয়া।এখন যদি আপনার বোনকে অ্যাবর্সন করানো হয় তাহলে আপনার বোনের প্রাণের ঝুঁকি আছে।আপনি কি করবেন ভেবে দেখুন।৫০/৫০ চান্স।
আমি একথা শুনে বেশ ভয় পেয়ে বললাম
-থাক এ ঝুঁকি নিয়ে কিছু করতে হবে না।
তৃণাকে নিয়ে বাসায় চলে আসলাম।বাসায় আসার পর খালাকে বলার পর খালা বলল
-মরে গেলে মরে যাক।এরে নিয়ে কই যাব আমি।আমার মানসম্মান কিছু থাকবে না।আমি এখন আত্নহত্যা ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।
-খালা এসব কিছুই করতে হবে না দেখা যাক কি হয়।আপনি স্থির রাখুন নিজেকে কালকে এসে দেখি কিছু করতে পারি না।
খলাকে কোনরকম শাত্ত্বণা দিয়ে খালার বাসা থেকে নিজের বাসায় চলে আসলাম।ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম কি করা যায়।রাজিব বাসায় আসার পর রাজিবকে ঘটনা বললাম।রাজিব আমাকে আমতা আমতা করে বলল
-তুমি যদি কিছু না মনে কর আমি একটা কথা বলব।
-হ্যা বল।এতে এত আমতা আমতা করার কি আছে?
রাজিব ভয়ে ভয়ে বলল
-সাদিয়া আমাদের তো একটা বাচ্চা নেই।আমরা যদি তৃনাকে এখানে এনে রাখি আর তৃণার বাচ্চাটাকে নিজের করে নেয় তাহলে কেমন হয়।
বাহ এভাবে তো ভেবে দেখি নি।রাজিবের বুদ্ধিটা বেশ ভালোই লাগল।কিন্তু বিয়ে বহির্ভূত তৃণাকে এখানে রাখলে আত্নীস্বজনের হাজারটা উত্তর দিতে হবে এ বাচ্চা কার এটার জবাব দিতে।কিন্তু তৃণাকে যদি রাজিবের বউ করে আনি তাহলে কেউ এমন প্রশ্ন উঠাতে পারবে না।আর তৃণাও আমার কাছে ভালো থাকবে।এমনিতেও অন্য কোন মেয়ে বিয়ে করালে রাজিবকে হারানোর ভয় ছিল।কিন্তু তৃণাকে বিয়ে করালে রাজিব ও আমারেই থাকবে।অনেক ভেবে চিন্তায় রাজিবকে বললাম
-তা আনা যায় তবে তৃণাকে তোমার বিয়ে করতে হবে।না হয় সবাই বিষয়টা খারাপ চোখে দেখবে। এছাড়া তোমার উপরও অবৈধ সম্পর্কের আঙ্গুল উঠবে।আমার মনে হয় তুমি তৃণাকে বিয়ে কর।
রাজিব একথা শুনে প্রথমে রাজি হল না।পরে আমার যুক্তি শুনে রাজি হল।আমারও বেশ শান্ত লাগল মন এটা ভেবে যে রাজিবকে একটা বাচ্চা তো দিতে পারব এবার।যার বাচ্চায় হোক মা ডাক তো শুনতে পারব।
পরদিন সকালে খালার বাসায় চলে গেলাম।খালাকে আমার প্রস্তাবটা শুনালাম।খালা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল
-আজকে তুই আমার জন্য আর নিজের বোনের জন্য যা করেছিস আর কোনদিন ভুলব না।
আত্নীয়স্বজন জানানো হল।সবাই রাজি হল।কারন তৃণা মানসিক ভারসাম্যহীন এতে করে আামার সংসার ও নষ্ট হবে না।তৃণাও ভালো থাকবে আর আমিও।যাইহোক বিয়ের দিন ঠিক করা হল।
অতঃপর আজকে বিয়ে সম্পন্ন হল।তৃণাকে লাল টুকটুকে বউ করে সাজিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে আসলাম।
তৃণাকে একটা রুমে বসিয়ে........
লেখিকা-শারমিন আঁচল নিপা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন